এপিটাফের খসড়া
ঘরের অলস দাওয়ায় বসে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে তারাখসা দেখতে পাই এখন। গেঁটে বাত পেরিয়ে লাল নীল সবুজ হলুদ তারারা খসে পড়ছে এক এক করে। আঙুলের ঘর গুণে দেখতে থাকি কতগুলো বসন্ত পেরিয়ে এলাম খাদের ওপারের হাতছানিকে ফাঁকি দিয়ে। নীরব হিসেবের ঘরে শূন্যতা জমে জমে শুষ্ক বরফ হয়ে গেছে কেবল। আরও জমবে। জমতে জমতে আমিও কোনো একদিন বরফিলি মানবে পরিণত হব ভবিষ্যতের গা ঘেঁষে অতীত পেরিয়ে যাওয়ার পর। ভাবি, কোনো একদিন কেউ এসে আমার পলকা ঢিবিটায় গাঁইতি-শাবল চালিয়ে আমার দেহ উদ্ধার করে আমার পাপ-পুণ্যের হিসেব করবে সাদা জমির বুক চিরে। তারপর আমাকে চালান করে দেবে ব্রহ্মাণ্ডের সীমানার ধারে। সেখানে কাকে পাব বা পাব না জানি না, তবে নিজের তারাখসার গল্পটা আমি বেশ দেখতে পাই। কে কবে আমার হিসেব করবে তার মেয়াদী অপেক্ষা করার চেয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখে গেলাম। চাইলে পড়ে দেখতে পারো।
সালটা তখন ২০৭০ বা ৭১। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর কোনো এক বন্ধুর জমিতে হোঁচট খেয়ে পড়বে কোনো এক হলুদ পোড়া বসন্তের মিইয়ে যাওয়া বিকেলে। সেদিনের সকালে আমেজ থাকবে যৌবনবতী শীতের। চায়ের কাপে লেগে থাকবে ফেলে আসা দিনের বিষণ্ণতা আর মনখারাপের রেণু। খবরের কাগজে ভেসে আসবে মেঠো ভারতের বুক থেকে ‘রাজনীতি’ শব্দটা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে চিরতরে। স্বজন-পোষণ বলে কিছু নেই আর। কাশ্মীরের বুকে জেগে থাকা উজ্জ্বল শপিংমল থেকে আপেল কিনে ফিরবে কাঁটাতারের ওপারের বখাটে প্রেমিক। বিকেলে ওর বন্ধুনীকে নিয়ে ডাল লেকে ভেসে বেড়াবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে প্রকৃতিকে। আমার ছেলের কাজের অফিস থেকে একটা জরুরী ফোন আসবে কোনো একটা নতুন গুরুতর বিষয়কে কেন্দ্র করে, মেয়েটা অভক্তি মিশিয়ে ডিমটোস্টের দিকে তাকিয়ে বলবে, মা, এই সব আমার খেতে ভালো লাগে না কতবার বলেছি। তাও কেন দাও এসব? আমার সরলা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আমাদের ফেলে আসা দিনগুলো ঝালিয়ে নেবো আরেকবার।
দুপুরের অলস প্লেটে জেগে থাকবে সুক্তো, যা আমার ভীষণ প্রিয়। আরও কিছু থাকলেও থাকতে পারে, মনে পড়ছে না আমার। বয়সেরও তো নিজস্বতা বলে কিছু আছে নাকি…! আমার নিজের কোনো ভাই বোন নেই ঠিকই, অথচ আমার ভাই বোনের হিসেব থাকবে না কোনো। মামাতো ভাই সকালের ফোনে জানাবে সে দ্বিতীয়বার দাদু হয়েছে এবার। ফুঁ দিয়ে অভিমান উড়িয়ে হেসে হেসে কথা বলব অনেকক্ষণ। তারপরে বাড়ির সামনের সোনালি ধান জমির দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যাব কোথাও। ঝাঁপিয়ে পড়ে ফিরিয়ে আনবে আমারই কোনো এক উত্তরসূরি। হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাবে একটা সুপুরি গাছের তলায়। ওপরের দিকে তাকিয়ে আমার মনে পড়বে ছোটোবেলায় দু’টো সুপুরি গাছ কিনে আনতে গিয়ে এক বন্ধুর বাইকে ২০০ টাকার পেট্রোল ভরে দিতে হয়েছিল। আর সেই গাছগুলো কেমন আছে খোঁজ নেওয়া হয়নি অনেক দিন। মনে পড়তেই স্মৃতি-মেদুর হয়ে একবার হাতটা গুটিয়ে মুঠো করব নিজের অজান্তেই। তারপরে….
আমার অর্ধেকটা জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখব, চেয়ারের গা’য়ে রোদ লাগাতে গিয়ে নিজের ওপরেই অনেকখানি ধূসর ছায়া ফেলেছে। একবার জাগিয়ে দিতে গিয়েও জাগানো হবে না আর। মনে হয়, অতীতের ঢালু জমিতে গড়িয়ে গিয়ে উল বুনছে আপনমনে। শিথিল হাতের আলগা মুঠোয় ধরা কাগজের সুদোকু আর পায়ের কাছে শান্তিতে বিশ্রামরত কলম। মনে হবে, থাক, সারাটা জীবন বিরক্ত করে এসে শেষবেলায় আর নাই বা করলাম। সিজ্ন চেঞ্জের ধাক্কায় কয়েকবার কাশি হবে আমার। লোলচর্মসার গলার শ্লেষ্মাটা একবার ঝেড়ে নিয়ে আবার চোখ দুটো বন্ধ করব পিছনে ফিরে তাকাবার নেশায়। স্মৃতিপটে দেখব, কলেজে যে ছেলেটার সাথে আমার খুব কথা কাটাকাটি হয়েছিল ‘বাংলা’ বানানে ‘ঙ’-র অভিমান নিয়ে, সেও আমার মতো বুড়িয়ে গিয়ে পড়ন্ত বিকেলের রক্তিম রোদ মাখছে গা’য়ে। তার আশেপাশে অনেকগুলো কুকুর। তারাও মখমলি ঘাসের চাদরে গা এলিয়ে দিয়েছে মালিকের আশকারায়। ওর নামটা খুব করে মনে করার চেষ্টা করব কিন্তু কিছুতেই পারবো না মনে করতে। ওর কথাগুলো মনে পড়বে, ও বলেছিল শেষ বয়সে ও পোষ্যদের সাথে কাটাতে চায়। আমারও ইচ্ছে ছিল। আমি পারিনি। গৃহলক্ষ্মী মেনে নেয়নি এই লোকটার বেপরোয়া অন্যায় আবদার। যাক সে কথা, আমি ভালো আছি। ভালো থাকতে হয়…
আমি দেশ বাড়িতেই থাকি। শহরের মুখের ওপর একটা বড় আঁচিলের মতো জেগে আছে গ্রামটা। খুব ইচ্ছে ছিল মাঝ-বয়সে এসে একটা জলো পুকুর করাবো। হয়ে ওঠেনি। ঘরের পুকুরের মাছ খাওয়ার সাধ হয়তো পূরণ হবে না আর এ জীবনে। ইচ্ছে ছিল, কোনো এক লাগামহীন শীতের কিংবা আদুরে বসন্তের বিকেলে প্রদীপের নরম সলতের মতো নাতি-নাতনিদের নিয়ে রূপকথার বেগমবাহার চাষ করব লাঙলের গতি শ্লথ করে। অথবা কোনো এক ঝড়ের রাতে অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর করে দেবো আমার খেয়ালি কুহকে। তারপর এক এক করে বায়োস্কোপের ছিদ্রে ওদের চোখ রাখতে বলব আমাদের বর্ণময় অতীত দেখাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে। আমিও দেখব কিছু কিছু… বয়স বাড়লে লোভ বাড়ে যে। আর একটা ইচ্ছে ছিল— ভাবতে ভাবতেই হঠাৎই বুকের বাঁদিকে একটা মোচোড় উঠবে খুব জোরে। আমি হাতটা চেপে চিৎকার করব— ময়ূরাক্ষী…
মাঝে কী ঘটবে আমি জানি না। নিজেকে শিমূল তুলোর রেশমের মতো মনে হবে খুব করে। দেখবো ঘরের মেঝেতে আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। আমার চারপাশে অনেকে। এ কী…! সবাই কাঁদছে কেন?
—ময়ূরাক্ষী, এরা সবাই কাঁদছে কেন? আরে হলটা কী আমাকে কেউ বলবে? উত্তর আসবে না কোনো। এক রাশ বিরক্তি নিয়ে চিৎকার করে উঠব— অদ্ভুত সব…!! রেগেমেগে একটা ঝাঁকুনি দিতে যাব ময়ূরাক্ষীকে, আর তখনই কান্নায় ভেঙে পড়ে ও বলে উঠবে— আমার সব শেষ হয়ে গেল। মিতুন, সব শেষ হয়ে গেল।
মাথাটা আমার এমনিতেই গরম হয় তাড়াতাড়ি। তার ওপর এই সব দেখে কে আর মাথা ঠিক রাখতে পারে বলো তো। মিতুন, মানে আমাদের ছেলের দিকে তাকিয়ে ওকে বলব, আরে তোর মায়ের মাথাটা কি একেবারেই গেল নাকি? জবাব দেবে না ওরা কেউ। বউমা ফোনটা হাতে নিয়ে কাকে একটা ফোন করে বলবে, বাবা আর নেই।
নেই মানে? আমি কী মরে গেলাম তবে? হ্যাঁ, তাই তো। হাঁটুর ব্যথা বা বুকের বাঁদিকের ব্যথাটা তো আর নেই দেখব। তবে কী আমি সত্যি সত্যি…
হরির গুণগান করে আমায় কাঁধে করে শ্মশানে নিয়ে যেতে যেতে, পাশের বাড়ির মিচকে ছেলেটা বলবে, ‘দ্য এন্ড অব্ অ্যান এরা…’। আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারব না। শেষপর্যন্ত আমায় পুড়তেই হল। পোড়া জিনিসটাকে ভীষণ ভয় পাই। একবার সিগারেটের ছ্যাঁকায় হাত পুড়িয়ে যা কষ্ট পেয়েছিলাম…! একবার কাঠের উনুনে মা আলু পোড়াতে দিয়েছিল। তা বের করতে গিয়ে হাতের দফারফা করেছিলাম আমি। আর একবার পায়ে দাদ হয়েছিল ছোটবেলায়, তাতে আমার বড়মামা অ্যাসিড দিয়েছিল, জায়গাটা পুড়িয়ে দিতে। সব মনে পড়বে এক এক করে। যাক, সে সব ওরা জানবে না, জানতে চাইবেও না। আমাকে পুড়িয়েই ছাড়বে শেষ পর্যন্ত। আমি সত্যিই পোড়া জিনিসটাকে ভয় পাই…
মারা যাওয়ার পর এক একটা হার্ডল টপকে পৌঁছে যাব চতুর্থ দিনে। আমি এদের কাউকেই ছেড়ে যাব না। যেতে মন করে না যে…। পুরোহিত আসবে সেদিন একটা লম্বা চওড়া লিস্ট বগলদাবা করে। আমার নামে কুশ পোঁতা হবে। সবাই পাশের একটা বড় দিঘির পাশে বসবে। একটা কীর্তন দল অধিক প্রত্যাশার চাহিদায় তারস্বরে হরিকে এফোঁড় ওফোঁড় করবে সুরের বাণে। আমার কষ্ট হবে হরির কথা ভেবে। তাকিয়ে দেখব ব্রাহ্মণ বসবে একটা আম্রপালির ছায়ায়। সামনে ধূপ-দীপ জ্বলবে। আর আমার সর্বক্ষণের সঙ্গিনী, ময়ূরাক্ষী একটা সাদা কাপড়ে নিজেকে মুড়ে, মুষড়ে পড়বে কোনো এক বিচ্যুতির বেদনায়। দূরে কিছু চেনা জানা লোক আনমনে ধূপের ধোঁয়াকে উড়িয়ে দেবে বিড়ি কিংবা সিগারেটের ভারী ধোঁয়ায়। মামা বাড়ির ভাই, বোন, দিদি আসবে। ওদের সবার চোখে জল। ভাইয়ের মাথায় পাক ধরেনি এখনো। দিদি অনেক রোগা, আগের সেই জৌলুস আর নেই। বোনটাও দেখব নীচের দিকে তাকিয়ে একটা একটা ঘাস ছিঁড়ে চলেছে। টপ্টপ্ করে নোনাজলে ভিজে যাবে মাটি। ছেলেটা মায়ের পাশে বসে, মেয়েটা দিঘির ওপারে কিছু একটার খোঁজে তাকিয়ে আছে যেন…!! অনেক দিন আগে একবার বলেছিলাম, তুই যদি দিনের আলোতেও আমাকে দেখতে পাস আকাশের তারার মাঝে, তবে বুঝে নিস তুই আমাকে মন থেকেই ভালোবাসতে পেরেছিলি। আর যদি না পাস….। আমার মনেহয় আমাকেই খুঁজে চলেছে একটা দীঘল প্রমাণের বিশ্বাসে। মিতুনের ওপর খুব রাগ হবে আমার। ছেলেটা গাধা থেকে যাবে তখনো। ময়ূরাক্ষী এমন সাদা কাপড় পরতে পছন্দ করে না কখনো, আমি জানি। একবার সাদা জমির কাপড় এনে খুব বকা খেয়েছিলাম। মিতুন কলেজে পড়ে তখন। ভুলে গেল নাকি? ছেলেটা একই রকম থেকে যাবে…!!
সব কিছুর মধ্যে ময়ূরাক্ষীর কাপড়টাই বেমানান লাগবে। ওর জন্য মন কেমন করবে আমার…

রুজির টানে কখনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সেলসম্যান, কখনো পাবলিকেশন হাউসে টাইপিস্ট, কখনো হোটেলের রিসেপশনিস্ট আর প্রাইভেট পড়ানো। বিশুদ্ধ বেকারত্বের জ্বালা নিয়ে বর্তমানে গবেষণারত। কবিতা লেখার প্রতি আবেগের পাল্লা একটু ভারী। তবে গল্প, প্রবন্ধ কিংবা ব্যক্তিগত গদ্যের সাথে কোনো বিবাদ নেই। বইপড়া, লেখালিখি, সিনেমা নিয়েই ঘরসংসার। পরিপাটি নয়, অগোছালো কিন্তু… প্রথম কবিতার বই ‘বিবর্ণ ক্যানভাস’।
Post Views: 182
