অলভ্য ঘোষ

গামছা

তারকেশ্বর চললাম। কলকাতার ভিড়ে ঠাকুর দেখতে আমি বেরোই না। মিছিলে হাঁটি না।কিন্তু তারকেশ্বর দীর্ঘ আট বছর যাচ্ছি। এটা নিয়ে নয় বছর। কেন যাই এর পিছনে কোনও ধার্মিক কারণ। হাঁটতে ভালবাসি। আর এত মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ পথ হাঁটার আনন্দ অন্য রকম। মধ্য কথা সব কিছু হিসেব করে চলতে হবে কেন? হিসেবি দের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশিদিন টেকে না। আমি বেহিসেবী মানুষ। আমার কিছুই নেই। থাকার মধ্যে কিছুটা ইমোশন আছে। সেটুকুকে আমি ছাড়তে পারব না। মধ্য কথা আমি যেটুকু মানুষের কাছে পরিচিত সারা পৃথিবীতে। মধ্য কথা আমি যেটুকু মানুষের কাছে ভালোবাসা পাই। সেটা আমার ইমোশন টুকুর জন্য। আমার বাড়ি, গাড়ি ,ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কোনও কিছুর জন্য নয়। কারণ এগুলোর কোনওটাই আমার নেই। এগুলো ছাড়া আমার কাছে যা আছে তা নিয়ে আমি সুখী। আনন্দিত। পড়াশোনা, লেখালেখি ,সিনেমার বাইরে; খেলাধুলা, আর ঘোরা আমার খুব প্রিয়।আমি আমার মতোই থাকতে চাই।কারও মত হওয়ার আমার কোনও বাসনা নেই। কারও মত করে নিজেকে সাজাতেও চাই না।
 
 
জীবনের যাত্রা; জীবনটা তো একটা জার্নি। এই তারকেশ্বরের জল যাত্রী হিসেবে আসলে আমি সেই জীবনযাত্রার একটা শিক্ষা নিতে গেছি নয় বছর ধরে।একটা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। আদিবাসীদের মধ্যে ‘মাগসিম বলে একটি উৎসব হয়। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষজনের কাছে পয়লা মাঘ হোলো ‘মাগসিম’ উৎসব বা নববর্ষ। এদিন সকালে বটবৃক্ষের তলে পূজার্চনা করে তারা দীর্ঘ পথ হেঁটে যায়।একটা দীর্ঘ জীবন লাভের বাসনা নিয়ে। সেনাবাহিনীদের মধ্যে প্রত্যেকদিন নয় ন মাসে ছ মাসে একবার তাঁদের একশ কিলোমিটার পথ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছুটে অতিক্রম করতে হয়। এই চর্চাটা আসলে মনোবল বাড়িয়ে তোলার জন্য। শরীরকে কষ্ট সহিষ্ণু গড়ে তোলার জন্য। শারীরিক ক্ষমতার চেয়েও মনোবল যদি আমাদের আকাশচুম্বী হয় যে কোন অক্ষমতাকে আমরা জয় করে নিতে পারি। জীবন একটি যুদ্ধ; জীবন ও একটি অতিক্রম। আর এখানে মনোবল বাড়িয়ে রাখা খুব জরুরি।
 
এই যেমন এবারের যাত্রাপথটি নিয়ে বলি। অন্যান্য বারের যাত্রাপথে আমি ১৫ থেকে২০ কিলোমিটার যাওয়ার পরে একটুখানি রেস্ট নিয়ে যাত্রা করি। শারীরিক সক্ষমতা এবার আমার ছিল না। শরীরটা বেশ দুর্বল। হাঁটার অভ্যাসটা দীর্ঘদিন চলে গিয়েছে। তাই যাত্রার শুরুতেই আমাকে পরিকল্পনা করতে হয়েছে কী ভাবে এই যাত্রাটি করব? প্রতি পাঁচ কিলোমিটার অন্তর অন্তর। আমি বিরতি নিয়েছি। অন্যান্য বারের তুলনায় এ বার অনেক সকাল থেকেই আমি হাঁটতে শুরু করেছি।সময় লেগেছে বেশি। কিন্তু অতটা মালুম পায়নি। শারীরিক অক্ষমতার।
 
একটা ঘটনা ঘটল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে টালিগঞ্জ স্টেশনে এসে দেখলাম। আমি সাথে করে আমার গামছাটা আনতে ভুলে গেছি। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম টাকাপয়সা কিছু এনেছি তো? ইতিপূর্বে দুই বছর শেওড়াফুলির জলে ডুব মেরে উঠে দেখেছি আমার কাছে একটাকাও নেই। টাকা জলে ভেসে গেছে। অবশ্য তাতে কোনও রকম অসুবিধা হয়নি।ওই দুই বছর দুজন পুলিশ আমাকে সাহায্য করেছিলেন কিছু টাকা দিয়ে। তারপর থেকে মা প্লাস্টিক প্যাকেটের মধ্যে টাকা ভরে সেপ্টিপিন দিয়ে আমার প্যান্টের পকেটের সাথে আটকে দেয়। বুক পকেটে থাকে খুচরো কয়েকটা টাকা গাড়ি ভাড়ার জন্য। এই গোটা ব্যবস্থাটা মা করে দেয়। আসলে ব্যবহারিক এসব দিকে আমার কোনও খেয়ালই কোনও দিন থাকে না। কারণ আমার জীবনের অভিজ্ঞতা বলছে, এগুলো কোনও বড় সমস্যাই নয়। সাথে গামছা নেই। মুখ মোছার মতো কোন কাপড় নেই। পরনের বস্ত্র টুকু ছাড়া। আমার কাছে আর কিছুই নেই।
 
এমন অবস্থায়।একটা গামছা;একটা দার্শনিক দিক উন্মোচিত করে দিল। আমাদের কত আয়োজন; এই জীবন অতিবাহিত করার জন্য। এই সব আয়োজনই গামছা টির মতো। নিরাপত্তা, নিশ্চয়তার জন্য;আমরা নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য কত সম্পর্কে জড়াই। আমরা স্বাচ্ছন্দ্যেতার জন্য বাড়ি, গাড়ি কত উপাদানের আয়োজন করি। ক্রমে ক্রমে এই গামছা তেই অভ্যস্ত হয়ে উঠি। গামছা তেই আটকে যাই। গামছাই সহায় সম্বল হয়ে ওঠে। আমার সংসার হয়ে দাঁড়ায়। এই খড়কুটোর অবর্তমানে পান থেকে চুন খসলেই অস্বস্তি বেড়ে চলে।একটা গামছা আমি কিনে নেবো রাস্তা দিয়ে? ঠিক করলাম না। কোনও রসদ কোনো উপাদান; প্রয়োজন নেই।প্রয়োজনীয়তা তার প্রয়োজন নিজেই মেটাবে। গামছা নিয়ে অস্বস্তিটা সামান্য কিছু ক্ষণ ছিল। তার পরে আর গামছার কথা মনেও থাকল না।
 
আমি যতবার তারকেশ্বরে গেছি প্রতি বছর বৃষ্টি হয়েছে। এ বারে এক ফোঁটা বৃষ্টি ছিল না। গামছা নেই মাথা মোছার বালাই নেই। শেওড়া-ফুলিতে স্নান করে বাতাসে গা শুকলাম। পথে তিন চারবার পাইপের জলে স্নান করলাম। পথের বৃষ্টিতে ভিজতে না পারা; আমার আক্ষেপ ছিল।আমি যে বৃষ্টি ভিজতে প্রচণ্ড পরিমানে ভালোবাসি। এ বারে প্রথমবার; প্রথমবার একটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। বাবার মাথায় জল ঢালতে গিয়ে আমি স্নান করে বেরিয়ে এলাম। প্রায় দুই তিন বড় বড় ঘড়ার জল আমার মাথায়।
 
জীবনে গামছা নিয়ে বেশি মাথা ঘামিও না এটাই বোধহয় শিক্ষা ছিল। তারকেশ্বরে এটাই আমার শেষ যাত্রা। এই যাত্রায় আমি এই শিক্ষাই পেয়েছি। আর তারকেশ্বর আমি কোনদিন যাবো না। পায়ের তলায় অনেকগুলো ফোস্কা পড়ে রয়েছে। পা ফেলে হাঁটতে পারছি না। কিন্তু এই যাত্রার পরে মনে আনন্দ প্রসন্নতা জীবনকে নতুন ভাবে দেখতে পারা অনেকটাই রয়েছে। যে কোনও যাত্রা এই জন্যই বাঞ্ছনীয় হয়ে ওঠে।
 
শ্রী রবি ঘোষ ও কমলা ঘোষের তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্র অলভ্য ঘোষ ১৯৭৬ সালের ১০ জুন কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম গ্রহণ করেন; ছোট থেকেই একরোখা অলভ্য প্রথাগত শিক্ষা সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাশীল-প্রতিবাদী। শিল্প কলা তার উপজীব্য হলেও ব্যতিক্রমী এই মানুষটি নিজেকে একজন সৈনিক বলে মনে করেন যার অস্ত্র কালি মাটি কলম। দেশে বিদেশের পত্র পত্রিকায় তার কাব্য, ছোটগল্প, প্রবন্ধ সসম্মানে প্রকাশিত হবার পর তিনি স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে আত্মমগ্ন।
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + thirteen =

Shopping Cart
Scroll to Top