ডাকঘর – এক চিঠির গন্তব্যের অন্বেষণ
মাধব দত্তের ডাকঘরে এক বেনামী চিঠি এসেছে হঠাৎ। কোনও কালির আঁচড় পড়েনি তাতে এখনও। অদ্ভুত, সাদা, ঠিকানাহীন চিঠি। খেয়ালি বাদল হরকরা, শরৎ হরকরার পাল্লায় পড়লে সে চিঠি পৌঁছে যেতে পারে ভুল ঠিকানায়। সাদা কাগজের কলুষিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর সংশয়ের অবকাশ নেই। কত অপ্রয়োজনীয় ভাবনাই না স্থান পেতে পারে তার বুকে। তাই শাস্ত্রজ্ঞ কবিরাজের কথা মেনে মাধব দত্ত তাকে সাবধানে ভরে রাখে তালা দেওয়া ডাকবাক্সের ভিতর। ডাকবাক্সের সদর দরজা বন্ধ সর্বদাই। শুধু একরত্তি ছোট্ট চিঠি ফেলার ফাঁকটুকুই যা একটু বাইরের আলো বাতাস পৌঁছে দেয় সেই অমল চিঠির কাছে। অপাপবিদ্ধ চিঠি হাপিত্যেস করে অপেক্ষা করে থাকে কিছু বার্তার। যে বার্তারা অলংকৃত করবে তার জীবন, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করবে তাকে। বাক্সের জানলায় বসে প্রতীক্ষা করে যায় সে এক গতিময়তার, যা তাকে পৌঁছে দেবে গন্তব্যে। তার গায়ে ছাপা হবে ঠিকানা, তার গায়ে লেখা হবে জীবনের নিরন্তর যাত্রার কাহিনি।
একে একে বার্তারা আসে। দইওয়ালা নিয়ে আসে কর্মময় জীবনের উপাখ্যান। চিঠির বুকে আঁকা হয় পাঁচমুড়া পাহাড়, শামলী নদী, লাল শাড়ি পরে জল আনতে যাওয়া মেয়েদের ছবি। চিঠি কল্পনায় তার গন্তব্যের রেখা পাতে। ওই পাহাড় পেরিয়ে, ঝরনার জল পায়ে পায়ে কেটে এসে একদিন পৌঁছে যাবে তার কাজের ঠিকানায়। কাজেই যে তার মুক্তি! কাজে না লাগলে আর কীসের জীবন!
প্রহরী আসে সময়ের বহমানতার বার্তা নিয়ে। সাদা চিঠির মনে সে গেঁথে দিয়ে যায় বাণী -” সময় বয়ে যায়”। চিঠিকে আশ্বস্ত করে যে সে নিশ্চয়ই একদিন পেয়ে যাবে তার লক্ষ্য। প্রকৃতির হরকরা ঠিক একদিন তার নামে এনে দেবে মুক্তিপথের আমন্ত্রণ পত্র।
সবজান্তা মোড়ল আসে এরপর। সে অহংকারী, ঈর্ষাকাতর, হিসেবী। চিঠির গায়ে সে লিখে রাখে তাচ্ছিল্য। সে দেখায় যে যাত্রার পথে শুধু ভালো না অনেক মন্দ বার্তাকেও গ্রহণ করতে হবে। লক্ষ্যে পৌঁছাতে গেলে ভালো-মন্দের দোলাচল অতিক্রম করতে হবে সমান উদারতার সঙ্গে।
তারপর সুধা আসে মল ঝমঝমিয়ে। অমল হৃদয়ের সে রেখে আসে ফুল ও ভালবাসার বার্তা। নির্মল চিঠি ভিজে ওঠে প্রেম সুধার পুষ্প বৃষ্টিতে। সুধা কথা দেয় সে কোনদিন ভুলবে না এ চিঠির প্রতীক্ষার কাহিনি।
অতঃপর ঠাকুরদা আসেন ফকিরের বেশে। বেরিয়ে পড়ার আগ্রহে উদগ্রীব চিঠির বুকে তিনি লিখে দেন দুনিয়ার যত পথের গল্প। তিনি বলেন, দেখার মতো দেখতে গেলে সত্যি কানা হওয়া প্রয়োজন আর খোঁজার মতো খুঁজতে গেলে প্রয়োজন ভিতরের দিকের রাস্তাটিকে চেনা। ছোট্ট চিঠি অন্তরের দৃষ্টি মেলে ধরে পথের দিকে। পথ চিনতে চায়। হীরকের মতো স্বচ্ছ যে ঝর্ণার জল সেই জলের অক্ষরে তার হৃদয়ে চিত্রিত হয় মানচিত্র। সেই মানচিত্র বেয়ে একদিন সত্যিই আসে রাজার বাড়ির আমন্ত্রণ পত্র।
মাধব দত্তের ভয়, মোড়লের পরিহাস ধুলিস্যাৎ করে অরূপের চিঠি নিয়ে হাজির হন রাজার দূত, রাজ কবিরাজ। ডাক বাক্সের সব তালা চাবি মুহূর্তে অবান্তর প্রতিপন্ন হয়। হু হু করে বাতাস আর আলো প্রতিযোগিতায় মেতে ঢুকে আসে অমল হৃদয়ে। চিঠির উপর হীরক আখরে রচিত হয় রাজার ঠিকানা। চিঠি চোখ বন্ধ করে, মুখ বন্ধ করে। সঙ্গে সঙ্গেই খুলে যায় তার অন্তরের সমস্ত দরজা। আর কেউ তাকে আটকে রাখতে পারে না। সমস্ত প্রতীক্ষার অবসানে সে ভিতরের পথ চিনে বেরিয়ে পড়ে। যে পথে মিলন হবে তার নিজের সঙ্গে নিজের। যে পথের অন্ধকার দূর করবে তার নিজের চোখের আলো। যে পথ তাকে টেনে নিয়ে যাবে তার নিজের পরম ঠিকানায়।

ব্রততী চক্রবর্তী
একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষিকা l শখ – বইপড়া, গান শোনা,আর টুকটাক লেখালেখি l কিশোর ভারতী, সানন্দা, সাপ্তাহিক বর্তমান, জয়ঢাক সহ বিভিন্ন পত্রিকায় ও গল্প সঙ্কলনে লেখা প্রকাশিত হয়েছে l
প্রকাশিত বই নাড়িতে মোর রক্তধারা। ঋতভাষ প্রকাশনী
প্রকাশিত বই নাড়িতে মোর রক্তধারা। ঋতভাষ প্রকাশনী
Post Views: 193

