চাঁদ, বাতিক ও একটি হাসি-মোছা কার্ড
কারা যেন আমায় দেখে হাসে:
অ্যাসাইলাম থেকে একলা ফেরার সময়, খানিকটা অসংযত, অথচ নিজের মধ্যে ভীষণ সচেতন, আমি বাড়ির পথ অযথা দীর্ঘ করতে থাকি। মাথা নিচু করে হাঁটার মধ্যে একটা তীব্র সুখ আছে। নিজেকে নৈর্ব্যক্তিক ভাবে ভালো লাগতে থাকে! ক্রাইসিসগুলোকে সহসা মহৎ ভেবে নেওয়া যায়! মাঝে মাঝে এর-তার মুখে সার্চলাইট ফেলছি! কেউ আমাকে আদৌ ভ্রুক্ষেপ করছে না! কেন করবে? আমি কে? একটা মর্বিড শহরে আমি কি প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই সুস্থ? অন্ধকারে হঠাৎ কারা যেন আমায় দেখে হাসে! স্কিৎজোফ্রেনিয়া আমার পরিবারে কারও নেই! তবু (কিংবা অথচ) আমি স্পষ্ট শুনতে পাই, আমাকে পাক দিয়ে দিয়ে অশরীরী প্রেতের দল হাসির হররা তোলে! এই তো, এইতো চাই! আমার সর্বাঙ্গে হাসির কুঁচি ঝিকঝিকিয়ে ওঠে! দৌড়তে আলস্য লাগে বলে আমি চাঁদের দিকে একটু একটু ঝুঁকে যেতে থাকি…
প্রজ্ঞা আমায় দিনদিন মূর্খ করে নাকি?:
ঠিক একটা মুচকি হাসি অনেক অভ্যাসে আয়ত্ব করার পর থেকে আমার সমস্যার পরিমাণ কার্যত অর্ধেক। বিনিপয়সায় যে লাইব্রেরিতে বই পড়া যায় আর কাঠবেকার নয় যে রমণী, সেই দুইয়ের ভরসায় এক লহমায় ঘর ছাড়ি আমি। ঘর মানে বাস্তবিকই ঘর। যখন বেঁচে থাকা অংশত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়, তখনও আমার এক অনিবারণীয় বাতিক, প্রায় ব্যধিগ্ৰস্ত এক বাতিক, আমায় তিলে তিলে বাঁচিয়ে রাখে। আমি জুড়তে থাকি পাতায় পাতায়, আখর থেকে আখরে। লাইব্রেরি কি পুংলিঙ্গ? রাস্তায় এলোপাথাড়ি হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে আমি শুধু রাস্তাকেই চিনে নিতে থাকি, শহরকে নয়। আজকাল সেই পথগুলোতে গর্ত দেখলেও আমি তত্ত্ববিশ্ব উজার করে ভাবনা প্র্যাকটিস করি। আমার এই বাতিকের কল্যাণে, কাঠবেকার নয় যে রমণী, তার প্রায় অপত্যস্নেহ অধিকার করে বসি ক্রমশ। পুং লাইব্রেরি এবং স্ত্রী সেই রমণীর কক্ষগত, যোনীগত, অস্তিগত শূন্যতা পূরণ করবার অবসরে নামতা ঝালিয়ে নিই আজকাল। এভাবেই দুষ্প্রবেশ্য এক জ্ঞানের জগতে আচমকাই বৈষয়িক বিনিয়োগ করে ফেলি আমি। ফল হয় মারাত্মক! মূর্খতার ক্যামোফ্লেজ আমাকে ঘোরতর বিষয়ী করে তোলে ধীরে ধীরে।
কারা যেন চিনে ফ্যালে এইবারে:
(শোনা গেছে গথাম শহরে একটা অ্যাসাইলাম ছিল। এও শোনা গেছে যে গথাম বলে একটা শহর ছিল! দার্শনিকরা একটা বিশেষ হাসি আর একটা নাচ নিয়ে গবেষণা করে দেখতে পারেন)
নানাবিধ গর্ত ও আবর্জনা এড়িয়ে, কখনও ফুটপাথের ভিড়ে বীরেন চাটুয্যে আওড়াতে আওড়াতে আমি এক অনির্দিষ্ট উচ্ছৃঙ্খলার পানে এগোতে থাকি। এগোতে থাকি সুনিশ্চিত আত্মবিশ্বাসে। কবজিতে ঘড়ি, ঘড়িতে সময় বেঁধে একসময় রেলব্রিজও পার হয়ে যাই। পার হয়ে যাই অনায়াস অস্থিরতায়। এরপর চটি খুলে ফেলে, উচ্ছ্বসিত আমি ঘাস আবিষ্কার করি। ঘাস আবিষ্কার করি প্রায় জীবনানন্দীয় ব্যতিক্রমে। হঠাৎই চারপাশে কাচ নেমে আসে। আমি লক্ষ করি, স্বচ্ছত আমি অনেকের অনেক অনুবীক্ষণে ফোকাসিত। খানিক বাদে এদিক ওদিক থেকে নিশ্চিন্ততার নিঃশ্বাস শুনি। তারা আমায় ঠিক চিনে ফ্যালে এইবারে। ক্যামোফ্লেজ খুলে প্রকৃত বোকার মতোই চোখ পিটপিট করি। পাভলভিয় রিফ্লেক্সে হাত উঠে যায় মাথার ওপর।
শুদ্ধতাও একটি বাতিক, নাকি?:
(চন্দ্রাহত= বিণ. পাগল। সং. চন্দ্র+আহত; moonstruck শব্দের অনুকরণে। সংসদ বাংলা অভিধান)
চাঁদের দিকে মাত্রাতিরিক্ত না ঝুঁকলে এই হাল হয় কারও? চাঁদ তো আর নিজে থেকে ঝুঁকে আসে না! ‘বিস্মৃতি একটা উপহার’ লিখে খোয়াবনামা দিয়েছিলাম প্রিয় বন্ধুকে। (অর্থাৎ নিজেকে, কিংবা কাকে, ঠিক মনে পড়ছে না। ফাঁপা হাততালি কুড়োতে এসব চমক দিয়েই থাকি নিজেকে)। শক্ত, স্পষ্ট অথচ স্পর্শকাতর সেই মনকে কোনও গ্ৰহ, উপগ্রহ অথবা নক্ষত্রের দিকে ঝুঁকতে বারংবার মানা করা সত্ত্বেও সে তার ঝোঁক বজায় রাখে। হাসি এবং কার্ড একসঙ্গে বের করে আপসজীবন রক্ষা করে সে। এদিকে আমাকে বিশেষজ্ঞরা চিনে ফ্যালার পর থেকে দিনদিন গুটিয়ে যেতে থাকি আমি। অন্ধকার বিছিয়ে শুয়ে থাকার অভ্যস্ত একাকিত্বে বিষাদ তর্জমা করি একের পর এক। ব্যধিগ্ৰস্ত সেই বাতিকটিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবার আমাকেই উদ্যোগী হতে হয়! দ্রুত বুঝে যাই, বাতিক কোনও অসুখ নয়। সুখও নয় যদিও। বাতিক, সম্ভবত যাপন জাতীয় একটি বিশেষ্যমাত্র!

লেখক পরিচিতি: জন্ম জলপাইগুড়ি। বাংলা সাহিত্য নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। নবারুণ ভট্টাচার্যের ছোটগল্পের ওপর এম ফিল করে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্য নিয়ে পিএইচডি করেছেন। প্রিয় সাহিত্যিক জীবনানন্দ দাশ, রাজশেখর বসু এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। প্রবন্ধ ও পুস্তক সমালোচনা লেখেন। ভালোবাসেন ব্যক্তিগত গদ্য এবং ছোটগল্প লিখতে।
Post Views: 147

