
শহুরে রাতের শব্দজব্দ
সন্ধে থেকে গগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা ছবি খুলে বৃষ্টির শব্দ শুনছি। ছবির নাম, ‘city in the night’। শহরে কখনও রাত হয় না। রাত বাড়লে আলো বাড়ে৷ অলিগলির কাটাকুটি খেলায় রেফারি শেপার্ড ডগের থেকেও বেশি চকিত।
— ছবির রাত্রি জ্যামিতিক। অনেকগুলো রঙের মধ্যে হলুদ কমলা স্ট্রিট লাইটের ম্যাট শেড দেখলে মনে হচ্ছে মিশমিশে প্রহর জেগে পাহারা দিচ্ছে অবচেতন ঔদাসিন্য৷ ত্রিকোণা পাখি বসে আছে— নির্লিপ্ত ঠোঁট থেকে সোজাসুজি খুঁজে পেলাম মগ্ন আইরিস। যেন ব্যাকহোলের ভেতরে কিংবা আরও গভীরে জেগে থাকা কালের মস্তিস্ক। ঠিক এই জায়গায় ছবির সাথে ক্রমশ জুড়ে যাচ্ছি। রাত্রি দ্বিপ্রহরের সপ্ত ঋষি ঢুকে পড়ছে — কে জেগে আছে, কেই-বা নথিভুক্ত করছে জলঘুঙুরের নামতা?
“Night’s caresses are tender as velvet,
but they come from a sky
where angels have turned their backs.”
— Charles Baudelaire
গগেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বডলেয়ারের মধ্যে একই ফেরেস্তার যাতায়াত ছিল কিনা আমার জানা নেই৷ কিন্তু মখমলি চাদর শরীরে জুটলে দেখেছি দেহতত্ত্বের অবকাশ নিজেকে খুঁজতে ব্যস্ত হয় ৷ তখন মহাজাগতিক দৃশ্য যা কিছু অদৃশ্যজ্ঞানে সংগ্রহ করছে ঘড়ির কাঁটা, তাদের উদ্দেশ্যে আলো জ্বালি। ঘরে ফেরার গান গাই। অথচ প্রতিটি ঘর, সৃষ্টির আলিঙ্গন ছাড়া সম্পূর্ণ সমুদ্রের ঢেউ৷ প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে স্নান করা যায়, কিংবা তীরে বসে জলের কোলাহল শোনা যায়৷ মহাবিশ্বের কোলাহলের রঙ নেই৷ না আছে ভিন্নতা৷ ব্রহ্মধ্বনির অণুরণনে মিশে গেছে অযুত-নিযুত নগ্ন গল্প।
এর পরেও এক একটি শহর লুকোচুরি খেলে রাত বাড়লেই৷ যেমনটা গগেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোট্রেটে in ও at-এর সমাগম হয়েছে। কিছু ফ্যাকাসে জায়গা থেকে ছিটকে পড়ি। রাত্রি অন্ধকার হয়, কিন্তু ফ্যাকাসে হয় কি? অনেকগুলো মুখ চৌকো ঘরের ওপর জড়ো হলে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে— বিগত আঠেরো বছর ধরে এমনটাই দেখেছি বাড়ির ছাদ থেকে। যেখানে রাত ঘন হলেই মাদুর পেতে গ্রহ নক্ষত্ররা শুয়ে পড়ে, যেখানে আত্মা সংযম হারিয়ে ছুঁয়ে দেয় অরুন্ধতীর আঁচল।
সেই বা কে?
শহর জেগে আছে জোড়া চোখে, গিলে নিচ্ছে মাছরাঙা স্থাপত্য। অলিতে-গলিতে একটা আমি থেকে বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার আমি—ত্রিকোণা ঝিলমিল।
নীলম সামন্ত
বেশ কিছুদিন যাবৎ কবিতার সাথে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। নিজের লেখালিখির পাশাপাশি কবিতার আলো নামক একটি পত্রিকার সহসম্পাদক। কবিতার আড়ালে জীবনের গল্প বলতে ভালোবাসি। কবিতা প্রকাশিত হয়ছে দুই বাংলার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। বাসস্থান পুনে হলেও মনে প্রাণে বাঙালি। প্রবাস থেকেই এই কাব্যচর্চা। কবিতার সাথে মুক্তগদ্য এবং প্রবন্ধের কাজও করে থাকি।
প্রকাশিত দুটি কাব্যগ্রন্থ, মোমবাতির কার্ণিশ এবং ইক্যুয়াল টু অ্যপল। প্রকাশিতব্য প্রেমের গদ্য সিরিজ জোনাক সভ্যতা।

Post Views: 264
