রুমা ভট্টাচার্য

পুকুর-কথা

মল্লিকদের পুকুরে পুতুলদি ডুবে মরেছিল। আত্মহত্যা করেছিল ও। পুতুলদি খুব ভালো সাঁতার জানত। তবু ডুবে গিয়েছিল। যেদিন পুতুলদিকে খুঁজে পাওয়া গেল না, তন্নতন্ন করে সারা পাড়া, সম্ভাব্য সব জায়গা, মায় থানা পুলিশ সব ফেল পড়ল, তখন হারান জ্যেঠু বলেছিল,
— একবার পুকুরটায় দেখলে হয় না?
ডুবুরি এনে পুকুর খোঁজা হল। তারা দু’জনে মিলে তুলে আনল পুতুলদির দেহ। ফুলে ঢোল হয়ে পুতুলদির দেহ ভেসে উঠেছিল তখনই। কলসিতে পাথর ভরে, তার মুখ আটকে গলায় বেঁধে ও ডুব দিয়েছিল। তারপর থেকে পুকুরে যেতে আমাদের ভয় করত।
তবে, এসব অনেক পরের কথা। তার আগে মল্লিকদের পুকুরঘাট ছিল আমাদের কাছে একটা বিরাট আকর্ষণের জায়গা। সত্যি বলতে, উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি কাশীপুরে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে ওঠা আমার আর বোনের কাছে আমাদের মামার বাড়িটাই ছিল বড় মুক্তির জায়গা। বীরভূমের বোলপুরে মামার বাড়ি যাওয়া হতো স্কুলের গরম বা শীতের ছুটিতে। তখন বোলপুরের এত বোলবোলা ছিল না। ছিল না এত ঘরবাড়ি, হাউজিং কমপ্লেক্সের ছড়াছড়ি। গ্রাম্য পরিবেশে দারুণ কাটত দিনগুলো আমাদের। মামার বাড়ির পাড়াতেই ছিল মল্লিকদের পুকুর। বিশাল পুকুর। মল্লিকদের সেই সময় ওখানে প্রচুর জমিজমা ছিল। তারা কাটিয়েছিল সেই পুকুর। তাই তার নাম মল্লিকদের পুকুর। পাড়ার নামও তাদের নামে, মল্লিক পাড়া। আমাদের মাতামহ মল্লিকদের মতো ধনী না হলেও যথেষ্ট সম্পন্ন পরিবার ছিল তাঁর। দুই মামার পরে মা একমাত্র কন্যা হওয়ায় আমাদের সবার খুব আদর ছিল মামার বাড়িতে। মামার বাড়ি গেলেই আমরা ছোটমামার কাছে বায়না ধরতাম পুকুরে সাঁতার শিখিয়ে দেওয়ার জন্য। ছোটমামা খুব হুজুগে ডাকাবুকো মানুষ ছিল। বলত,
— চল, এই ছুটিতে তোদের সাঁতার শেখাবই।
দাদু বলতেন,
— না। মল্লিকদের পুকুর ভীষণ গভীর। দিদিভাইদের ওখানে নামানোর দরকার নেই। শেষে একটা বিপদ হতে কতক্ষণ? 
আমরা ঝুলোঝুলি করতাম,
— দাদুর কথা শুনো না ছোটমামা। সাঁতার শেখাও আমাদের।
অবশেষে আমাদের জয় হতো। আমাদের দু’বোনকে নিয়ে ছোটমামা পুকুর ঘাটে নামত। ঠান্ডা কালো জল। বিশাল গোল পুকুরের ধার ঘেঁষে বড় বড় তাল, নারকেল গাছের সারি। গাছগুলোর ছায়া প’ড়ে পুকুরের জল আরও কালো দেখাত। ছোটমামার হাত ধরে জলে নামলেই ভয় ভয় করত। এক সময় ভয় কেটে গিয়েছিল। আমরা দুই বোনই ভালো সাঁতার শিখে গেলাম। মামার বাড়ির দোতলার জানলা থেকে দেখা যেত পুকুর ঘাট। সারাদিন সেখানে চলে মানুষের ব্যস্ততা। আমরা ফাঁক পেলেই ঘাটে গিয়ে বসতাম। পুতুলদিকে ছোটবেলা থেকেই চিনি। আমাদের চেয়ে কিছু বড়। কতদিন যে ঘাটে বসে আমি, বোন, পুতুলদি, আরও বন্ধুরা মিলে ব্যাঙাচি খেলেছি! এই খেলাও পুতুলদিই শিখিয়েছিল আমাদের। ব্যাঙাচি খেলার জন্য পাতলা টালির টুকরো জোগাড় করা হতো। সেই টালির টুকরোগুলো টিপ করে জলে ছুড়ে মারা হতো। জলে ছোট ছোট ঢেউ তুলে টুকরোগুলো ব্যাঙের মতো লাফাতে লাফাতে টুপ করে ডুবে যেত। যার টালির টুকরো সবচেয়ে বেশি লাফাত, সে জিতত। সাধারণত বিকেলে চলত খেলা। ধীরে সন্ধে নামত। পুকুরের কালো জল আরও কালো হয়ে আসত। পাড়ের ধারে ধারে কচুরিপানা আর শ্যাওলা ঝাঁঝিতে জমাট বাঁধত ঘন অন্ধকার। তখন মামার বাড়ির সবসময়ের গৃহসহায়িকা লক্ষ্মীপিসি ডাকতে আসত আমাদের,
— ও দিদিমুনিরা এবার ঘর চল কেনে। মা ডাকতিচে তোমাদের।
এ তো গেল বিকেলের কথা। সকাল থেকে দুপুর অবধি পুকুর ঘাটে চলত বিবিধ কার্যকলাপ। আশেপাশের বাড়ির অনেকেই ঝপাঝপ স্নান সারত পুকুরে। কাপড় কাচা, বাসন মাজামাজিও  চলত। তবে বাসন মাজা মল্লিকদের ঘাটে তেমন দেখিনি। দেখতাম, এদিকের পাড়ের উল্টো দিকে। মল্লিকদের ঘাট ছিল শান বাঁধানো। সিঁড়ি নেমে গেছে থাকে থাকে। ঝকঝকে পরিষ্কার। আর অপর পাড় ছিল ওপাড়ের বাসিন্দাদের দখলে। তারা জাতে দুলে, বাগদি। বড়দের কাছে শুনতাম। এসব জাত-টাত তেমন বুঝতাম না, আজও না বুঝতে চেষ্টা করি। দুলেদের ঘাট সিমেন্ট বাঁধানো ছিল না। তালগাছের গুঁড়ি ফেলে ফেলে ধাপ তৈরি করা থাকত। সেই ধাপে বসে তারা আছড়ে আছড়ে কাপড় কাচত। বাসন মাজত। সবটাই কেমন ছন্দময় লাগত আমার চোখে। 
মামার বাড়ি থেকে আবার কাশীপুরে আমাদের বাড়িতে ফিরে এলে আমি মনমরা হয়ে থাকতাম ক’দিন। কিচ্ছু ভালো লাগত না। পড়াশোনায় মন বসত না। 
 
একবার গরমের ছুটিতে বোলপুর গিয়ে শুনলাম পুতুলদি পুকুরে ডুবে মরেছে। কেন মরল, কী বৃত্তান্ত, কিছুই আমরা জানতে পারলাম না। তখন অনেক কিছুই আমাদের থেকে লুকিয়ে রাখতেন বড়রা। পুতুলদির মৃত্যুর খবর মনে গভীর ধাক্কা দিয়েছিল আমার। পুকুরের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ভাবতাম, কী সাঙ্ঘাতিক রহস্য লুকিয়ে আছে ওই পুকুরের বুকের গভীরে। হয়ত সে-ই জেনেছিল পুতুলদির আত্মহত্যার আসল কারণ। হয়ত শেষ মুহূর্তে পুতুলদি বলেছিল পুকুরের জলের কানে কানে। পুকুরটা যে বড্ড প্রিয় ছিল পুতুলদির।
এরপর সন্ধের দিকে পুকুর ঘাটে যেতে ভয় করত কেমন। কোনো প্রত্যক্ষ কারণ ঘটেনি ভয় পাওয়ার মতো। তবু। এই ঘটনার পরে পরেই মল্লিকরা পুরো পুকুরপাড়টা বাঁধিয়ে দিয়েছিল। গোল করে সিমেন্ট দিয়ে। দুলে বাগদিদের বাসন মাজা, কাপড় কাচা নিষিদ্ধ হয়ে গেল। শুধু স্নান করার অনুমতি দেওয়া ছিল। কেন যেন পুকুরের সেই আকর্ষণ আর রইল না। পাড়ার কুচোকাঁচাগুলো জলে ঝাঁপিয়ে স্নান করত। কিন্তু আমার আর ইচ্ছে হতো না জলে নেমে সাঁতার কাটার। পুকুরের ধার ঘেঁষে ভেজা মাটির পাড় ধরে ঘাস আর নানা বুনো ঝোপের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সেই অনুভূতি আর কোথায়? পুকুরটাকে বাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য আমার মনে হতো, ও যেন বন্দী হয়ে গেছে। মানুষের হাতে। 
দিন যায়, বছর যায়। আমরাও বড় হয়েছি। হয়ত ছোটবেলার বিস্ময়গুলো বড় হয়ে আর তেমন তীব্র থাকে না। তাই আমার পুকুরের প্রতি মুগ্ধতাও ধীরে ফিকে হয়ে আসে। তবু, মামার বাড়ি গেলে দোতলার জানলায় দাঁড়ালে মল্লিকদের পুকুর থেকে ঠান্ডা জোলো হাওয়া গায়ে মুখে আলতো  হাত বুলিয়ে দিয়ে যায়। চুপচাপ দেখি।
 
বেশ কয়েক বছর পরে হঠাৎ বোলপুরে গিয়ে চমকে গেলাম – মল্লিকদের পুকুর বোজানো হয়েছে, সেখানে নাকি মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং উঠবে। বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছিলাম, রাবিশ ফেলে পুকুরটাকে নিষ্প্রাণ করার চেষ্টা চলছিল। এখন জানলাম, প্রোমোটারের হাতে সে পুকুর বেচে দিয়েছে মল্লিকরা। ব্যাপার দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। বোলপুরের আশেপাশে এখন পুকুরের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। কলকাতায় আমাদের বসবাস অঞ্চলের কথা তো বাদই দিলাম, খুঁজে পেতে হয়ত কালে কস্মিনে একখানা পুকুর দেখেছি কি দেখিনি। পুকুর বুজিয়ে মানুষের বাসস্থান তৈরির হিড়িক লেগেছে! বড় দু:খজনক। কোনোদিন ভাবিনি মল্লিকদের পুকুরও একদিন বোজানো হবে। 
 
মামার বাড়ির দোতলার জানলায় দাঁড়ালে ঘন লম্বা গাছগুলোর ফাঁকে ফাঁকে এখন আর চোখে পড়ে না সেই উদাসী পুকুর- গ্রীষ্মের দুপুরে যে খর রোদের নীচে শান্ত হয়ে বিশ্রাম নিত! অথবা কনকনে শীতের ভোরে ঠান্ডায় তিরতির করে কাঁপত তার জল! আর পুতুলদি? মাল্টিস্টোরেড  বিল্ডিঙের নীচে ওর কি দম আটকে আসে না? কোনো গভীর নিশুতি রাতে চাইলেও পুকুরে চিৎ সাঁতার দিয়ে ও ওর পাড়াটাকে আর দেখতে আসতে পারবে না!
বুজে যাওয়া পুকুরগুলোর সঙ্গে সঙ্গে কত স্মৃতি, কত গল্পও তলিয়ে গেছে কালের গর্ভে। কে আর তার খবর রাখে?!
 
 রুমা ভট্টাচার্য। কলকাতা শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বেথুন কলেজ থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির শখ। কবিতা পছন্দ হলেও গল্পের প্রতি বেশি আকর্ষণ। সাংসারিক কর্মব্যস্ততার মাঝে সময় বের করে লেখালেখির চেষ্টা। আরও আনন্দ, আজকাল রবিবাসর এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে। একাধিক গ্রন্থিত গল্প সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে নিজের সৃষ্টি। 
 
 

1 thought on “রুমা ভট্টাচার্য”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − three =

Shopping Cart
Scroll to Top