সৌমী আচার্য

আহ্বান ও দ্বিধার শেষে

 
অদ্ভুড়ে গাছগুলো ডাক দিয়ে যায় নাকি দূরে থাকার ভয় দেখায় তা বোঝা বড় দায়। রাত গভীর অন্ধকারে ঢাকা। অলৌকিক আলো আকাশে। ফ্যাকাশে নীল। সেই প্রেক্ষাপটে স্বর্ণলতা জড়ানো গাছগুলো অল্প হাওয়ায় দোল খায়। তাদের সারা গায়ে জোনাকি। মোহিত হয়ে চলতে শুরু করলেই বিভ্রান্তি, ডাকছে নাকি ঠেলছে দূরে আরও দূরে। অথচ তাদের কাছে যেতেই সাধ, সোহাগের চুয়াচন্দনে সাজাতে সাধ, হৈহৈ সঙ্গের সাধ। কেন এত ভয়, কুন্ঠা! ভৈরবকাকা এসে দাঁড়ায় তার গায়ে ধুনোর গন্ধ। চোখ দুটো মৃদু কৌতুকে ঘাড় নাড়িয়ে যায়।
 
-যত বুঝ্‌বা তত বোঝা বাড়বো, তার চায়া বলদ থাহা ভালো। আরে এত ভাবো ক্যান?
 
কথাগুলো কান জুড়ে খেলা করে, বোধের কঠিন বেড়া টপকে ভিতরে যায় না। সারা শরীর জুড়ে বিষ। যার মায়া চোখ, মিষ্টি হাসি নিরাপদ মনে হয় সেখানেও ঔদাসীন্য চরাচর জুড়ে। গাছগুলো ডাকে আবার বাধা দেয়, মানুষও তেমন। ভৈরবকাকার খড়ি ওঠা পিঠ অন্ধকারে স্পষ্ট, জগৎ সংসারের ভার নিয়েও পরম শান্তি তার কোথা থেকে আসে? বাতাসের হাহা শব্দে শুনতে পাই, অন্ধকারের ভিতর জেগে থাকে যে আলো সে আলো নিজের মনের, তুষ্ট থাকার মতো সদ্‌ইচ্ছাই মানুষকে ভাসিয়ে রাখে ডুবতে দেয়না। তবু অন্ধকারে পথ হাতড়ে চলি। স্বপ্নাচ্ছন্ন জীবন। এই সত্যি বলে প্রতীত হয়, এই সব ভুল। ভৈরবকাকা কেবল হাসে, শুধু তার হাসির অর্থ বদলে যায়। ঝিরঝিরে একফালি রোদ অলস ভাবে গায়ের উপর পড়ে রয়েছে, ছেড়ে যাবার নাম নেই। নিজের শরীর হাতড়ে একটাও এমন সখ্যতা খুঁজে পাইনা।
 
-এতো বাইরের খেলা, তুমার মনের ভিত্‌রে কিছু টের পাও?
 
 
পাই আবার পাইনা। সব যেন হিসেব নিকেষের জটিল ছক। পিচুটির আঁশের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখা অভ্যাস আখ্যান। সংসার কেবল চায়, পায়েসের স্বাদ, আতুড়ের ঘ্রাণ, কাঁসাপিতলের হিসেব, লৌকিকতার খুঁতখুঁতে চর্বিতচর্বণ। এরমাঝে সন্ধ্যা ঘনায়। চোখ জুড়ে ভয়। গোধূলি হারিয়ে আসন্ন লালচে আভা।অতৃপ্ত মন। আচড়কামড়ের দাগ জ্বলজ্বলে। হা ঈশ্বর! আমি কোথায়? নিজেকে চেনা হল না, জানা হলনা। পাওয়া হল না পরম সত্য। আপন হল না কেউ আমিও হলাম না কারোর। কেবল খরচ হল জীবন। শূন্য হয়ে মহাশূন্যের পথে যাত্রা। ভৈরবকাকা উঠে পড়ে। হেঁটে চলে যায় আগাত মধ্যাহ্নের ভিতর। বলে যায়, কর্মের ভিতরেই তুমি, তুমিই কর্ম। আর যা কিছু কষ্ট দুঃখ সে সব জলের উপর দাগ। ক্ষমা করো, ত্যাগ করো। সত্যিই সুন্দর।
 
আগুনের শয্যার ভিতর কমল ফুটে ওঠে। নিরাকারে সমর্পন। যে বিশ্বাসে স্থির হয় বাঁকাচোরা পথ, যোগাসনে বসে জীবন সেই বিশ্বাসের কাদামাটি নিয়ে খেলা করে মন। কী গড়তে কী গড়ে? কী চায়। যা ছাড়িয়ে উঠতে চায় আবার সেখানেই ফেরে। সন্তান মুখ, সঙ্গসুখ, বান্ধব পরিজন। নুন তেলের হিসেব ঘুরেফিরে মকড়সার জাল বোনে। পরমার্থে উৎসর্গ করে ভোগ, আশ্চর্য দর্পণে ভাসে আপন রসনার তৃপ্তি। কোথা যায় কোথা আসে? ভৈরবকাকা হাসে। কেবল হেসেই যায়। দগদগে অসুখ নিয়ে জড়ের মতো পড়ে থাকে জীবন। আঘাতে বামপাশ রক্তাক্ত হলে তুখোড় হয়ে ওঠে মুখ, আঘাত ছুটতে থাকে প্রত্যাঘাতের আশায়। রিক্ত রক্তাক্ত হাতে ফিরতে হবে জেনেও এ এক আশ্চর্য গমন। হা ঈশ্বর বলে, দু হাত তুলে এগিয়ে যায় যে তার পথের ধূলি সোনায় মোড়া। মানুষের ভিতর যে খুঁজে পায় পরমের স্পর্শ তার শোকতাপ জুড়িয়ে যায়। অহং এর ফানুস উড়িয়ে দিয়ে ভারমুক্ত সে জন কাছে টানে এ চরাচর। চাঁদরাতে তখন ভৈরবকাকার গা ঘেঁষা বসা যায়। দূরে প্রেতের মতো গাছেরা তাদের দেখে মায়া হয়।
 
-হা ঈশ্বর হা ঈশ্বর করি কাঁদলি হব! নিজের ভিত্‌রে যে আছে তারে বোঝা লাগব। মনডারে স্বচ্ছ জল করি গড়লি ছায়া পড়ব জগৎ সংসারের। তখন বুঝবা, কুন আঘাত হিদয়ে নেবা আর কুন আঘাত ভাসায়ে দিবা ভাগীরথীর জলে।
 
শেষরাতের ভয় কাটে। গেঁজিয়ে ওঠা জীবন ও দ্রাক্ষারস। দুয়ারে কড়া নাড়ে মেষপালক। দুরুদুরু বুকে এখন অমৃতের পুত্রকে অভ্যন্তরে আহ্বান জানানোর পালা। জ্বালা, যন্ত্রণা, ভয় একটু একটু করে মিলিয়ে যায় সাদা ক্যানভাসে।
 
 
সৌমী আচার্য্য
পেশা: শিক্ষকতা
নেশা: লেখালিখি, নাটক, আবৃত্তি, নাচ ও ভ্রমণ
বাস: কল্যাণী, নদীয়া
প্রকাশিত গ্রন্থ: খুঁজে ফিরি তারে(উপন্যাস), সাপলুডো(গল্পগ্রন্থ) অচেনা অসুখ(গল্পগ্রন্থ)সাসপেন্স(নাট্যসংকলন) জ্বরে পুড়ছ ফিনিক্স(কবিতা সংকলন)
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + sixteen =

Shopping Cart
Scroll to Top