
আমার দাদু
সকাল বেলায় দাদুর সঙ্গে প্রাইমারি স্কুলে পড়তে যেতাম। তখন স্কুলে মাটিতে বস্তা পেতে বসতে হত। তাই বাড়ি থেকে বগলে দেবে বস্তা নিয়ে যেতাম। স্কুল ছুটির পর আবার দাদুর সঙ্গে বাড়ি ফিরতাম। দাদু ছিল সেই স্কুলের হেডমাস্টার। স্কুল যাবার সময় দাদু আমাকে গল্পের ছলে পড়া শেখাতো। বলতো, “মাঠের আলপথ বেয়ে আমরা যেমন স্কুল যাচ্ছি, ঠিক এভাবেই বিদ্যাসাগর স্কুলে যেতেন বুঝলি”। জমি ভর্তি ধান দেখে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আওড়ে বলতো, “রবীন্দ্রনাথ এই ধান নিয়ে কী লিখেছেন জানিস- ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোটো সে তরী/ আমার সোনার ধানে গিয়েছে ভরি’”। দাদুর কাছ থকেই চিনতে শিখেছিলাম বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথকে। তারপর বাড়িতে এসে দুপুরে খাবার পর বারান্দার চৌকিতে দাদুর পাশে শুয়ে শুয়ে বিদ্যাসাগর কীভাবে পথের ল্যাম্পপোস্টের আলোতে পড়া করতেন, কত লড়াই করে বিধবা বিবাহ প্রথা, বহুবিবাহ রদ আইন পাশ করিয়েছিলেন সেই গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম।
বিকেলে খেলার পর সন্ধ্যা হলেই বাইরে থেকে এসে ধুলো মাখা হাত-পা ধুয়ে উঠোনে মাদুর পেতে হ্যারিকেন জ্বেলে পড়তে বসতে হত দাদুর কাছে। আগের দিনের পড়া না পারলে মাথায় গাট্টা মারতো আর পেটের চামড়া এমনভাবে কষে ধরতো যে পরেরদিন ঝরঝর করে পড়া মুখস্থ বলে ফেলতাম। দাদু যেমন শাস্তি দিত তেমনি ভালোবেসে আগলে রাখত। খেতে বসে সবসময় নিজের পাতের ডিমটা আমাকে খাওয়াত। নিজে না খেয়ে আমাকে খাইয়ে দিয়ে বলতো, “ডিম খেলে শক্তি বাড়ে। পড়া মনে রাখতে পারবি। ডিম, দুধ খেতে হবে, তবেই তো বুদ্ধির জোর বাড়বে”। মা-বাবাকে ছেড়ে থাকা একটা শিশুকে দাদু এভাবেই মানুষ করেছিল।
সন্ধ্যায় পড়া হয়ে গেলে দাদু আমাকে প্রতিদিন একটা করে গল্প শোনাত। সব গল্প আজ আর মনে নেই। কিন্তু কিছু গল্প—যা ভোলার নয়। গল্পে শুনতাম পরাধীন দেশে এই গ্রাম কেমন ছিল। একটা গল্প ছিল সতীদাহ নিয়ে। সেই গল্প জেনারেশনের পর জেনারেশন এখনও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। দাদুর বাবা মৃত্যুঞ্জয় দত্ত ছিলেন পরাধীন দেশের মানুষ। মৃত্যুঞ্জয় দত্তের বাবার এক পিসি ছিলেন। তাঁর নাম মনে নেই। অল্প বয়সেই সেই পিসির বিয়ে হয়। কিন্তু মন্দ কপালের জন্য বিয়ের কয়েকবছরের মধ্যেই স্বামী মারা যায়। এই ‘দেচাপড়া’ গ্রামেই তাঁদের দাহ করা হয়। তখন দেচাপড়ার নাম ছিল দয়ানগর। এমন শ্রুতিমধুর ‘দয়ানগর’ নাম থেকে কীভাবে অপ্রভ্রংশ হয়ে ‘দেচাপড়া’তে পরিণত হল জানিনা। সেই পিসির বর যখন মারা যান তখন কিন্তু দেশে রামমোহন সতীদাহ প্রথা রদ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে এরকম প্রত্যন্ত গ্রামে সেই আইন এসে তখনও পৌঁছায়নি। যদি গ্রামেও সেই কঠোর আইন এসে পৌঁছাত তাহলে সেই পিসির সতীদাহ হত না। সেই পিসির স্বামী মারা গেলে গ্রামের কিছু ব্রাহ্মণী মিলে পিসিকে সাদা থান পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় শ্মশানে। শ্মশান ছিল গ্রাম ছাড়িয়ে কয়েক মাইল দূরে একটা ক্যানেলের ধারে। এখন সেখানে আশপাশে অনেক বাড়ি তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই জায়গাটা এখনও জঙ্গলে ভর্তি আছে। সেই শ্মশানে পিসির স্বামীকে দাহ করার জন্য চিতা কাঠের উপর মৃত দেহকে প্রথমে শোয়ানো হয়। এদিকে পাশে গ্রামের মেয়েরা বিধবা পিসির সারা গায়ে তখন ঘি মাখাচ্ছে। তাঁর দু’হাত বাঁধা। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই চিতা কাঠের উপরে তাঁকেও শোয়ানো হবে। তারপর সেই চিতাকাঠের উপর শুইয়ে দিয়ে দমাদম ঢাক, কাঁসর বাজা শুরু হলে, ডোম তখন মশালের আগুনে চিতার কাঠ ধরিয়ে দেয়। আগুনের শিখা লকলক করে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে, আর সেই আগুনের সঙ্গে বুক ফাটা কান্না খোলা মাঠ পেরিয়ে আকাশের বুক চিরে বাতাসের মধ্যে গ্রামে এসে পৌঁছেছিল। গল্প শুনতে শুনতে আমি ভয়ে দাদুর কোল ঘেঁসে বসতাম। যুগ যুগ ধরে নারীদের লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা সেই গল্প বলা সন্ধ্যাকে করে দিত স্তব্ধ, বাতাসের মধ্যে ভেসে আসতো পিতৃতান্ত্রিক সমাজের গন্ধ। সেটাই ছিল গ্রামের শেষ সতীদাহ। আজও মামারবাড়ির সবাই মানে সেই পিসি সতী হয়ে তাদের বাড়ি আগলে রাখেন, বিপদ থেকে রক্ষা করেন। হায় রে পোড়া কপাল! যাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি, তাঁকে মেরে দিয়ে ঘর আগলানোর কাজে লাগিয়েছে এরা। আজ তাঁর আগুনে পুড়ে যাওয়া যন্ত্রণার হাহাকারকে নিজেদের বিপদ মুক্তের পথ বলে প্রচার করতে বাধে না।
পিসির সতীদাহ যেখানে হয়েছিল সেখানে আজও মাটি খুঁড়লে নাকি কয়লা পাওয়া যায় এমন বিশ্বাস রয়েছে। ছোটবেলায় আমিও সেকথা খুব বিশ্বাস করে একদিন আমার মাসতুতো দাদা নয়নদার সঙ্গে চৈত্রের প্রখর রোদকে উপেক্ষা করে সেই জায়গা গেছিলাম কয়লা আনতে। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে একটা জঙ্গলের কাছে গিয়ে যখন আমরা দু’জনে পৌঁছালাম তখন সূয্যিমামা মধ্যগগনে। বহুকষ্টে জঙ্গলের কাছাকাছি গিয়ে ভাবছি ঢুকবো কি ঢুকবো না এমন সময় একটা গাছের আড়াল থেকে মাথায় কাঠ নিয়ে এক বুড়িকে বেরিয়ে আসতে দেখেই আমাদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে গেছে। ভয় পেলে মানুষ সামনে পেছনে কোনোদিকেই এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারেনা, পা যেন মাটির সঙ্গে বিঁধে যায়। আমাদেরও অনেকটা তেমন অবস্থা। বুড়িটি আমাদের দেখতে পেয়ে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “তুমরা কারা? ইখানে কী করসো? বাসা কুথায় তুমাদের”? সে যে ভূত নয় সেটা বুঝতে পেরে আমদের ভয় কাটে। নিজেদের পরিচয় দিয়ে বলি কেন এসেছি এখানে। শুনে বুড়ি হেসে বলে “উ সব অনেক দিনের কথা। এখন আর কিসসু পাওয়া যায় না। ভর দুপুরে আর দাঁড়ান থিকো না। বাসায় যাও দিকিনি”।
আমরাও বাধ্য ছেলের মতো ওখান থেকে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ঘরে ফিরে আসি। দাদুকে না বলেই আমরা ওখানে চলে গেছিলাম। সেদিন ছিল চৈত্রসংক্রান্তি। এদিনে গ্রামে ‘বোলান’ হয়। ‘বোলান’ একধরণের লোকনাট্য। প্রধানত রাঢ় অঞ্চলের দিকে বোলান লোকনাট্যের দেখা পাওয়া যায়। দেচাপড়া গ্রামেও তখন বোলানের প্রচলন ছিল। বোলান সম্ভবত দু’ধরণের হয়ে থাকে— ‘পোড়ো বোলান’ ও ‘দাঁড় বোলান’। ‘পোড়ো বোলান’ দলে মড়ার খুলি নিয়ে শিল্পীরা তাণ্ডব নৃত্য করে, জাদু দেখিয়ে দর্শকদের আনন্দ দেয়। আর ‘দাঁড় বোলান’ প্রধানত সামাজিক ও পৌরাণিক বিষয়ভিত্তিক হয়ে থাকে। এই দলের শিল্পীরা সুষ্ঠুভাবে নাচ-গানের মাধ্যমে কাহিনি পরিবেশিত করে থাকে। একজন ওস্তাদ দলের নেতৃত্ব দেন। বোলান গান বাঁধা হয় পালার আকারে। আমার ভালো লাগতো রঙ্গরসের পালা। সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়, গোপন কথাগুলো বলে হাটে হাঁড়ি ভাঙা হয়। সেই সন্ধ্যায় দাদুর সঙ্গে ‘বোলান’ দেখতে বসেছি। অনেকক্ষণ পর দাদু আমাদের জিজ্ঞেস করতে থাকে যে, নয়নাটার সঙ্গে কোথায় গেছিলিস? সত্যি করে বল। আমি সত্যিটা বলে দিই। পরেরদিন সকালে বাড়ির সবাইকে আমাদের কীর্তিকলাপ জানিয়ে দাদু বলেছিল, “ওরে পাগল, মাটি খুঁড়লে যে কয়লা পাওয়া যায় সেই কয়লা কী আর ঐ সতীর? ওখানে দীর্ঘদিন মরা পোড়ানো হত কাঠ দিয়ে। সেই কাঠগুলো পুড়ে মাটি চাপা পড়ে থাকতো। তাই মাটি খুঁড়লে কয়লা পাওয়া যেত। এখন আর ওখানে কিছু পোড়ানো হয়না। তাই কয়লাও পাওয়া যায় না। আমি তো গল্পের জন্য বলেছি। ল্যালা না ল্যালায় বটিস তোরা”।
তারপর থেকে দাদু যে গল্প বলতেন কোনোটাকে সেভাবে সত্যি ভাবতাম না। কিন্তু তাও কিশোর বয়সে কিছু গল্প শুনতে শুনতে মনে হত গ্রামের সংস্কার শহরের থেকে কত আলাদা। সত্যি হোক বা মিথ্যে গল্পের কিছু জায়গায় শরীর ছমছম করে উঠতো। দাদু অল্প বয়সে কাঁদরা নামের জায়গায় চাকরি করতে যেত হেঁটে হেঁটে। গ্রাম থেকে হেঁটে প্রায় দু’ঘণ্টার রাস্তা। সেই রাস্তায় একটা বড়ো ক্যানেল পেরোতে হত। একটা সময় যাদের সন্তান জন্মের পরে পরে মারা যেত বা শিশুরা কোনও রোগের জন্য মারা গেলে তাদের দাহ করা হত না। মৃত শিশুদের ঐ ক্যানেলের নীচে সমাধি দিয়ে আসা হত। তখন প্রতি সন্ধ্যায় ঐ ক্যানেলের ওপর দিয়ে যাতায়াত করার সময় অনেকে শিশুদের কান্না শুনতে পেতেন। এমনই একদিন হয়েছে কি আমার মামারবাড়ির পাশের দাদু ছিলেন ভীষণ সাহসী ও শক্তপক্ত। তিনি ওই গ্রামের মেলাতে দোকান করেছিলেন। দোকানের জন্য প্রতিদিন রাত করে বাড়ি ফিরতেন। মাঝে মাঝে খাবার নিয়ে ফিরতেন। তখন সেই ক্যানেল পেরোলেই তাঁর পিছু পিছু কেউ অনুসরণ করে আসত, আর বার বার নাকি গলায় খাবার চায়তো। কিন্তু ঐ দাদু কোনোদিন ভয় না পেয়ে সোজা বাড়ি চলে আসতেন। তবে একদিন তাঁর মন ভয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তিনি তাঁর খাবার রাস্তায় ফেলে দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপর থেকে তিনি আর রাতের পর ঐ পথ ধরে যাতায়াত করেননি। এই ঘটনা যে সত্য সেকথা ঐ দাদুর কাছেও শুনেছিলাম। এই সমস্ত গল্প শোনার পর কৈশোর বয়সে সন্ধ্যার আগেই ভয়ে বাড়ি ফিরে যেতাম। বড়ো হয়ে বুঝেছি গ্রামের সংস্কৃতি, বিশ্বাস, আচার আচরণ শহরের থেকে অনেক আলাদা। গ্রামে সন্ধ্যায় বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে নেই, সন্ধ্যার পরে উঠোন, রাস্তায় জল ছুঁড়ে ফেলতে নেই তাতে মা লক্ষ্মী চলে যায়, মাটির বারান্দায় জল দিয়ে দাগ কাটতে নেই তাতে ঋণের বোঝা বাড়ে, রাতে হাত-পায়ের আঙুল ফোটাতে নেই…
আমার দাদুর ছিল একখানি রেডিও। সেটিই ছিল আমৃত্যু তার প্রিয় সঙ্গী। সকাল সন্ধ্যায় রেডিও চালিয়ে খবর শুনতো। প্রতি শনিবার শ্রুতি নাটক হত। এখন আমি থিয়েটার করি। কিন্তু ছোটোবেলায় দাদুর সঙ্গে রেডিওতে প্রতি শনিবার সেই নাটক শুনতে শুনতেই আমার মননে চিন্তায় কখন যে নাট্যবীজ পোঁতা হয়ে গেছিল টের পাইনি। তাই দাদুর দৌলোতেই আজ সেই নাট্যবীজের অঙ্কুরুদ্গম হওয়া শুরু করেছে। দাদুর সেই রেডিও যে কতখানি প্রিয় ছিল তা বুঝতে পারি ২০০০ সালের বন্যায়। সেই বছর গ্রাম ও আশেপাশের বহু গ্রামে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। যাঁরা নব্বই দশকের মানুষ তাঁদের নিশ্চয় ২০০০ সালের বন্যার কথা মনে থাকবে। তখন ভাদ্রের শেষের দিক করেই স্কুলের ছুটি পড়ে যেত। কারণ তখন বছর বছর আশ্বিনের প্রথম দিকেই দুর্গা পূজা হত। আমারও স্কুল ছুটি। সারাদিন খেলা করে বেড়াতাম। সেই বছর ভাদ্র মাসে কয়েকদিন ধরে তুমুল বৃষ্টিপাত শুরু হয়। সেদিন সবার মনে হয়েছিল এই বৃষ্টি ভাদ্রের বর্ষার। এত গরম। যাক একটু স্বস্তি পাওয়া গেল। কিন্তু টানা কিছুদিন মুষলধারে বৃষ্টির জন্য রাস্তা, পুকুর, জমিজমা জলে থৈথৈ করছে। চাষীদের মাথায় হাত। সমস্ত ধান গাছ জলের নীচে। আর কয়েকদিন থাকলেই সব পচে যাবে। ফসলও যাবে নষ্ট হয়ে। ইলেট্রিক বন্ধ। কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না, তখন দেখতাম দাদু তার একমাত্র ব্যাটারি চালিত রেডিওতে সারাদিন আবহাওয়ার খবর শুনছে মন দিয়ে। সেই খবর শুনেই দাদু গ্রামবাসীদের সাবধান থাকতে বলে। তারপর এক বিকেলে পঞ্চায়েত থেকে লোক এসে খবর দিলেন যে, ক্যানেলে জল ধরে রাখা যাচ্ছে না, পঞ্চায়েত থেকে সবাইকে সাবধানে থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।
রাত কত হবে মনে নেই। আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ ছোটো মামা আমাকে তাড়াতাড়ি ডেকে নীচে নিয়ে গেল। নীচে নেমে দেখি এক কোমর জল। আমাকে কাঁধে তুলে মামা জল পেরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আরেকটি বাড়িতে। সেদিন রাতে আর ঘুমাতে পারিনি। বাড়ির বারান্দায় দাদুর সঙ্গে চাদর জড়িয়ে আমিও শুনেছিলাম রেডিওতে খবর। পরেরদিন সকালে আশ্রিত বাড়ির বাইরে এসে দেখি, আশেপাশে সমস্ত মাটির বাড়ি জলে ভেসে গেছে। এতদিন যে বাড়িতে ছিলাম তার কোনও চিহ্ন নেই। চারিদিকে শুধু জল আর জল। দাদু পুরানো বাড়ি থেকে বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা, চাদর, লাইব্রেরি থেকে আনা দুটি বই আর রেডিও এই সম্বলগুলি দুর্যোগের মধ্যেও নিয়ে এসেছিল। আমি তখন আরও একটা জিনিস শিখেছিলাম যে, ভালোবাসার জিনিসকে বিপদের দিনেও বুকে জড়িয়ে নিয়ে আগলে রাখতে হয়।
পরের বছর দাদু প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার পদ থেকে রিটায়ার নেয়। দাদুর শিক্ষকতার মূল্য পাশাপাশি আর পাঁচটা গ্রাম পর্যন্ত বহাল ছিল। পাশের গ্রাম থেকে যাঁরা আসতেন দাদুর সঙ্গে দেখা করতে তাঁরা বাড়ির সদর দরজার বাইরে থেকেই ডাক দিতেন ‘হেডমাস্টার আছেন’? কেউ কেউ দাদুর নাম ধরেও ডাক দিতেন ‘মাস্টোর আনন্দদুলাল দত্ত আছেন’? তবে গ্রামের বেশিরভাগ ‘মাস্টোর’ বলেই সম্বোধন করতেন। পাশের মুসলিম গ্রাম থেকে অনেক ছেলে মেয়ে দাদুর কাছে টিউশন পড়তে আসতো। গরীব ছেলেমেয়েদের কোনোরকম টাকা নিতনা দাদু। আবার কেউ কেউ টাকা দিতে পারবে না বললেও দাদু তাঁকে পড়াতেন। বাড়িতে যখন অতিথি আসতেন কেউ, তখন ছাত্র-ছাত্রীদের এক একজনের কাছ থেকে একটা করে দেশি মোরগ দিয়ে যেতে বলতো। কারণ বেশিরভাগ মুসলমানদের বাড়িতে তখন মুরগীর চাষ হত। এছাড়াও দাদুকে ভালোবেসে জমির সবজি দিয়ে যেতেন অনেকে। আমি যখন সেই সব গ্রামগুলোই কখনও একা যেতাম তখন আমার পরিচয় আমি আনন্দদুলাল দত্তের নাতি শুনেই লোকে কত সম্মান দিতেন, ঘরে ডেকে হাতে বানানো হালুয়া খাওয়াতেন। তখন থেকেই ধর্ম আলাদা হলেও সেই সব মানুষদের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা গড়ে ওঠে, ছোটবেলাতেই বুঝে গেছিলাম হিন্দু-মুসলমান আলাদা ধর্ম শুধু, আলাদা মানুষ নয়। তাঁদের সেই আপ্যায়নেই আমি ভেবে নিয়েছিলাম বড়ো হয়ে শিক্ষকতায় করবো।
মহালয়ার আগের দিন দাদু ভোরবেলায় রেডিও চালিয়ে দিত। আমি দাদুর কাছেই শুতাম। ভোরের গভীর ঘুমের স্বপ্নে ভেসে আসতো ‘জাগো তুমি জাগো’ গান। তারপর শুয়ে শুয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ ও পঙ্কজ মল্লিকের সুরে বাণী কুমারের রচনায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় প্রমুখের কণ্ঠে একের পর এক গান শুনতাম ঘুমঘোরেই।
আমাদের গ্রামে একমাত্র একচালা বারোয়ারী মন্দির রয়েছে। আমার কৈশোর পর্যন্ত প্রথমে খড়ের চালের ছিল, তারপর হল টিনের চাল, বর্তমানে তা ইট-সিমেন্টের তৈরি পাকা মন্দিরে পরিণত হয়েছে। গ্রামের একমাত্র মন্দিরে বছরে তিনবার তিন মায়ের পূজা হয়- দুর্গা, কালী ও সরস্বতী। পাশের একটা গ্রাম থেকে এক বাঁধাধরা কুমোর নিতাই পাল ও তাঁর ছেলে আমাদের মন্দিরে প্রতিবছর প্রতিমা গড়ে যেতেন। এখন কারা গড়েন তা আর জানি না। তাঁরা যবে থেকে প্রতিমা গড়া শুরু করে দিতেন তবে থেকেই আমাদের ছেলেমেয়েদের পূজো শুরু হয়ে যেত। সারাক্ষণ ধর্ণা দিয়ে মন্দিরে পড়ে থাকতাম প্রতিমা গড়া দেখার জন্য। প্রথমে খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি, তারপর সেই খড়ের উপর একমাটি। একমাটি শোকানোর পর দুই মাটি। সবশেষে তিনমাটি দিয়ে রঙ। রঙ শোকাতে শোকাতে পঞ্চমী চলে আসতো। ঐ দিন রাত জেগে হ্যাজাকের আলোয় মায়ের শরীরে নিখুঁত ভাবে পরানো হত শুভ্র ডাকের সাজ। সেই সাজ পরানো দেখতে দেখতে শরতের ঠাণ্ডা হাওয়ায় চোখ বুজে আসতো। দুম করে ঘুম ছুটতো ঢাকের আওয়াজে। সাজ পরানো শেষ হলেই ঢাকের শব্দে গ্রামের লোকদের জানিয়ে দেওয়া হত। পরের দিন শুরু হত মন্দিরের সামনে ও চারপাশে বিভিন্ন গাছের পাতা ঝুলিয়ে ডেকরেট করা। শহরের মতো ঝকঝকে ঝলকানো আলোময় প্যান্ডেল আমাদের গ্রামে কোনোদিন হয়নি, আজও হয়না। গ্রামের সাজ প্রকৃতির থেকেই হত। আমরা ছোকড়ারা সারা বিকেল দড়ি দিয়ে মন্দিরের চারপাশটা বিভিন্ন পাতা দিয়ে, ফুল দিয়ে ঘিরে দিতাম। তারপর ঢাকে কাঠি পড়তো। ষষ্ঠীর দিন অবশ্য এর বেশি আর কিছু হতনা। বাড়ি গিয়ে হাত পা ধুয়ে পড়তে বসতে হত। কারণ পরপর চারদিন পড়াশোনা ডকে উঠবে। তাই ঐ দিন সন্ধ্যায় কোনো ছাড় ছিল না। দাদুর কাছে পড়তে বসতে হত। পূজোর চারদিন সারাক্ষণ পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারলেও দাদু ও দিদাকে সঙ্গে নিয়ে বিকেল বেলায় নতুন জামা পরে মন্দিরের আসতাম। দিদা ঘরের কাজের জন্য সবসময় আসতো না, কিন্তু দাদুর আঙুল ধরে চারদিন সকাল ও বিকালে মন্দিরে আসতাম। দশমির পরেরদিন গ্রামের নিয়মমতো দাদু আমাকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ে ভায়াতদের বাড়ি বাড়ি যেত শুভ বিজয়া জানাতে। দাদুর দৌলতে বড়োদের পা ছুঁয়ে সবার বাড়িতে তিন চারদিন ধরে প্রতি সন্ধ্যায় কত কিছু খেতাম— নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মুড়কি, ঝুরিভাজা, নিমকি, চানাচুর ইত্যাদি ভুঁড়িভোজ করে রাতের খাবারের বারোটা বাজিয়ে দিতাম। এভাবেই আবার দিনের পর দিন যেত, বছর গড়িয়ে আবার এক নতুন শরৎ আসতো। ঢাকে পড়তো কাঠি।
দাদুর সঙ্গে এভাবে দিন কাটাতে কাটাতে ২০০৪ সাল এসে যায়। বাংলার প্রথম মাস শুরু— বৈশাখ মাস। মাসের এক বিকেলে গোয়ালা না আসায় দাদু গেল গরুর দুধ দোয়াতে। দাদু সব দিক দিয়েই ছিল পারদর্শী। কিন্তু সেই গরুর পায়ে ছাঁদ দিয়ে রাখতে হতো। সেদিনও দেওয়া ছিল। কিন্তু গরুর শক্তির কাছে ছাঁদ দেওয়া খুঁটি টিকলো না। উবড়ে পড়লো ঝড়ের বেগে, আর দাদুর কাঁধে লাগলো গরুর লাথ। জায়গাটা দগদগে ঘা হয়ে গেল এমন যে ভর্তি হতে হল হাসপাতালে। তার আগে গ্রামের হাতুড়ি ডাক্তার শুম্ভু দাস চিকিৎসা করলেও টিটেনাসের ইনজেকশন দিতে হবে সেটা ধরতেই পারেননি। আসলে হাতুড়ে ডাক্তারের দৌড় সর্দি-কাশি-পেটব্যথা পর্যন্ত। হাসপাতালে যাবার দিন সকালে আমার হাত ধরে ভ্যানে চেপেছিল দাদু। চারদিন পর গরমের দুপুরে ঠাণ্ডা মাটির মেঝেতে ঘুমাচ্ছি। কাঁচা ঘুমে দিদা আমাকে ডেকে তুলে বললো যে, মুখ-চোখে জল নিয়ে একখান ভালো জামা-প্যান্ট পরেনে, দাদুকে দেখতে যাবি। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে যাওয়ায় কথাটা বুঝতে সময় লাগে। তারপর বাড়ি থেকে বের হতেই দেখি পাড়ার অনেকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফিসফাস করছে, আর আমাদের দিকে করুণ চোখে তাকাচ্ছে। হাসপাতালে পৌঁছে যখন দাদুর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, দেখলাম দাদুর চোখ দুটি বন্ধ, যেভাবে বাড়িতে ঘুমাতো, তেমনি ঘুমাচ্ছে…।

শুভঙ্কর দে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় এর বাংলা বিভাগ থেকে এম.এ করে, বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটার বিষয় নিয়ে এম.ফিল এর গবেষণা সম্পন্ন করে বর্তমানে ব্রাত্য বসুর নাটক নিয়ে পিএইচডি করছেন। লেখালেখি ও থিয়েটার মঞ্চে নিয়মিত যাপন করেন। লেখা প্রকাশ হয় নানান পত্রিকায়- কৃত্তিবাস, বহুরূপী, অনুষ্টুপ, সংবাদ প্রতিদিন, এই সময় ইত্যাদি। প্রকাশিত গ্রন্থ: ‘বাদল সরকার ও থার্ড থিয়েটার দলের ইতিহাস’।
Post Views: 260
