আমার প্রথম শান্তিনিকেতন
শান্তিনিকেতন নামটিতেই কেমন যেন একটা শিহরন আসে। বিশেষ করে যাদের কবিতা লেখার প্রবৃত্তি বা কবিতার একটা মন আছে তাদের কাছে শান্তিনিকেতন যাওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আমার জীবনে প্রথম শান্তিনিকেতনে যাবার অভিজ্ঞতা ঘটে দু হাজার ছয় সালে। তখন আমি ইংরেজি অনার্স থার্ড ইয়ারের ছাত্র। তখন সিলেবাসের পড়া বাদ দিয়ে রবীন্দ্র সংগীত স্মৃতিতে ধরে রাখার খেলা মনের মধ্যে কাজ করত, তাই শান্তিনিকেতন তখন আমার কাছে একটা কবিদের ইউটোপিয়া মনে হত। তাছাড়া পুরুলিয়ার রুখা মাটির সাথে বীরভূমের রুখা মাটির প্রান্তর, শীর্ণ কায়া তটিনীর বড় মিল পেতাম।
বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে ঠিক হল আমরা পৌষ মেলার সময় সব বন্ধুরা মিলে শান্তিনিকেতন যাব। সেইমতো আমরা পাঁচ জন বন্ধু মিলে তৈরি হলাম। বলাই বাহুল্য আমাদের বন্ধু বৃত্তের মধ্যে কবিতার লেখার বদ অভ্যাস আমারই ছিল। সেই জন্য আমি সমালোচিতও হতাম। যাই হোক আমরা বর্ধমান থেকে লোকাল ট্রেনে বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশনে নামি। ট্রেনে শান্তিনিকেতন স্টেশন আসার ঠিক আগে একজন ভিখারি “আকাশ ভরা সূর্য তারা” গানটি গাইছিল, তা আমার কাছে তখন এক অপার মুগ্ধতা ছিল।
ট্রেন থেকে নেমে ভ্যানে করে পৌষ মেলার মাঠের সামনে এলাম। কিন্তু হোটেলের প্রচুর ভাড়া হওয়ার জন্য আমরা সেখানে কোথাও থাকতে পারলাম না। পরিবর্তে অনেকটাই দূরে একটা কম দামি হোটেলে আমাদের ঠাঁই হোল। তখন আবেগ খুব বেশি। তাই হোটেলে ব্যাগ পত্তর রেখেই সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। যেখানেই যাই, ছায়ায় ঘেরা শান্তিনিকেতন এক অদ্ভুত অনুভূতির সঞ্চার করছিল। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম ছাতিম তলা, সেই বটবৃক্ষ, তালগাছ, উপাসনা গৃহ, কালো বাড়ি, শ্যামলী। মনে হল এই মাটিতে দাঁড়িয়ে কত অমর সৃষ্টি কবির কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে।
গাছের নীচে বেদি, সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা মুক্তাঙ্গনে পড়াশোনা করবে, কী অসাধারণ দর্শন! আমরা অভিভূত হলাম।
শান্তিনিকেতন একদিকে যেমন মনের আনন্দ, অন্য দিকে তেমনি শিল্পের পীঠস্থান। শিল্প যেখানে ছুঁয়ে গেছে মাটি। আমরা কলা ভবনের দিকে গেলাম। কালো বাড়ির গায়ে আঁকা চিত্রকলা গুলি অপরূপ লাগছিল। বড় বুদ্ধ মূর্তির তলায় দাঁড়িয়ে আমাদের কমদামি ক্যামেরায় ছবি তুললাম। তখন মোবাইল ছিল না। পরেই রামকিঙ্করের অসাধারণ সব ভাস্কর্যর কাজ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কলা ভাবনের ছাত্র ছাত্রীদের কাজ। বকুল তলায় গিয়ে কিছুক্ষন বসলাম। গুন গুন করে মনের আনন্দে গাইলাম। উপাসনা গৃহের সামনে গিয়ে মনে হল যেন মন্দ্র কন্ঠে গুরুদেবের উপসনা কানে ভেসে আসছে। সংগ্রহ শালায় গিয়ে কবির ব্যবহার করা বিভিন্ন সামগ্রী দেখার সৌভাগ্য হল। কেউ আমাদের খবর দিল যে শান্তিনিকেতনে নাকি প্রখ্যাত সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘একা এবং কয়েকজন’ নামে একটি বাড়ি আছে। আমরা উৎসাহিত হলাম।
প্রথমবার শান্তিনিকেতনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল শিল্পী সেলিম মুন্সীর সাথে সাক্ষাৎ। আমরা দেখতে গিয়েছিলাম তাঁর প্রদর্শনী। তিনি নিজের হাত দিয়ে তাঁর আঁকা ছবিগুলো আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। অনবদ্য সব আঁকা ছবি। ছাতিম তলায় পাঠদানের ছবি, দেশ নায়ক রাজীব গান্ধীর ছবি। তিনি আমাদের উৎসাহ দেখে আমাদের নাম ধাম জিজ্ঞাসা করলাম। পরে দেশের, সমাজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তাঁর অস্থিরতা প্রকাশ পেল। আমরা মুগ্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনছিলাম। তাঁর প্রদর্শনী থেকে ফিরে রুমে গিয়ে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে মাঝ রাত্রি পর্যন্ত আড্ডা চলে। মনে পড়ে আমি কলম দিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজে একটা ছাতিম গাছের ছবি এঁকেছিলাম। সেই স্মৃতি আজও অমলিন।
পরের দিন সোনাঝুরির হাট দেখতে গিয়েছিলাম। বাউলদের গান, সাঁওতাল রমণীদের নাচ মুগ্ধ করেছিল। মনে পড়ে পাশের জঙ্গলে আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম হরিণ দেখতে। সে দেখে আমার বন্ধুদের কী হাসি! রাত্রে মেলার মাঠে ঘুরে বেড়ালাম। কিনেছিলাম একটি বেতের টুপি। দুদিন পরে সকাল সকাল মহানগরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। স্টেশনের পাশের দোকানে হিংয়ের কচুরি আর ছোলার ডাল খেয়ে ট্রেনে উঠলাম কিন্তু মনে রয়ে গেল শান্তিনিকেতনের স্মৃতি। রাস্তায় সেই রেশ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। প্রায় ঘন্টা তিন পরে যখন উঠলাম তখন ব্যস্ত হাওড়া। পাশে কংক্রিটের ব্রিজ। বোলতার মতো ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে হলুদ ট্যাক্সি। আমরা হারিয়ে গেলাম। আফশোসের বিষয়, আমাদের সেই ক্যামেরার রোল হারিয়ে গেছিল। তাই এই লেখাটি ছাড়া আমার প্রথম শান্তিনিকেতন যাত্রার আর কোনো কিছু বেঁচে নেই, একরাশ স্মৃতি ছাড়া!

সুপ্রিয় দেওঘরিয়া পুরুলিয়া জেলার লক্ষণপুরে বসবাস করেন। বর্তমানে তিনি একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ান এবং গবেষণার কাজ সমাপ্ত করেছেন। তিনি মূলত কবি, তবে ছোট গল্প, অণুগল্প, মুক্ত গদ্য, এবং প্রবন্ধও লিখে থাকেন। এখনো পর্যন্ত মোট প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়টি । এই বইগুলিতে কবি প্রকৃতি, মাটি, মানুষ ও নিজের সাহিত্য যাপনের ভাষা খু্ঁজে চলেছেন ছন্দে ও ছন্দহীনতায়।
Post Views: 93
